ইসলামে শ্রমিকের দায়িত্ব ও অধিকার

0
204

ইসলাম শান্তির ধর্ম। মানবতার ধর্ম। মানুষে-মানুষে মায়ামমতা আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা প্রতিষ্ঠার ধর্ম। পরস্পর ভ্রাতৃত্ববোধ স্থাপন করা ইসলামের অন্যতম শিক্ষা। ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু, জাতপাতের ভেদাভেদ নেই ইসলামে। ইসলাম সমর্থন করে না কোনোরূপ শ্রেণিবৈষম্য। ইসলামের দৃষ্টিতে সব মানুষ সমান। সম্পদ, বংশ ও পেশার কারণে মানুষের মর্যাদা নিরূপিত হয় না। মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা নিরূপিত হয় নৈতিকতা, নিষ্ঠা ও খোদাভীতির ভিত্তিতে। ফলে যেকোনো পেশার লোক সম্মানের পাত্র। শ্রমিক-মজুর, দাস-দাসী, শিক্ষক, জেলে, তাঁতি, ব্যবসায়ী প্রত্যেকেই সমাজ বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। ইসলামে কোনো হালাল শ্রমই অমর্যাদাকর নয়, বরং মর্যাদার বিষয়। একমাত্র ইসলামধর্মই শ্রমিকের স্বার্থ পরিপূর্ণভাবে সংরক্ষণ করেছে এবং তাদের যথাযথ মর্যাদা দিয়েছে। নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেন, ‘তোমরা শ্রমিককে তার ঘাম শুকানোর আগেই পারিশ্রমিক দিয়ে দাও।’ (ইবনে মাজাহ : ২/৮১৭)
ইসলামে শ্রমের গুরুত্ব
ইসলাম মানুষকে হালাল শ্রমের প্রতি উৎসাহিত করে। পবিত্র কোরআনে উল্লেখ আছেÑ ‘অতঃপর নামাজ আদায় হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়, আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ কর এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও।’ (সুরা জুম’আ : ১০)। কোরআনে আরও উল্লেখ অছেÑ ‘নিশ্চয় আমি মানুষকে শ্রমনির্ভররূপে সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা বালাদ : ৪)। হাদিস শরিফে আছেÑ ‘কারও জন্য নিজ হাতের উপার্জন অপেক্ষা উত্তম আহার্য বা খাদ্য আর নেই।
আল্লাহর নবী দাউদ (আ.) নিজ হাতের কামাই খেতেন।’ (বোখারি : ২৭৫৯)
অন্য হাদিসে আছেÑ ‘হজরত আদম (আ.) কৃষিকাজ করতেন, হজরত দাউদ (আ.) বর্ম তৈরি করতেন, হজরত নুহ (আ.) কাঠমিস্ত্রির কাজ করতেন, হজরত ইদ্রিস (আ.) সেলাইয়ের কাজ করতেন এবং হজরত মুসা (আ.) রাখালের কাজ করতেন।’ (মুসতাদরাকে হাকিম)। মহানবী (সা.) নিজে মেষচারণ করেছেন। কাপড় সেলাই করেছেন। ঘর ঝাড়– দিয়েছেন। বালতি দিয়ে ক‚প থেকে পানি তুলেছেন। এমনকি রান্নার কাজও করেছেন। হজরত খাদিজার (রা.) সহকারী হিসেবে বাণিজ্য করেছেন।
শ্রমিকের প্রতি মালিকের আচরণ
ইসলাম যেমন শ্রমকে উৎসাহিত করেছে, তেমনি শ্রমিকের মর্যাদাও প্রতিষ্ঠা করেছে। সম্মানের আসনে সামাসীন করেছে শ্রমিকদের। শ্রমিক-মালিকের সম্পর্ক কেমন হবে, আচার ব্যবহার কী রকম হবেÑ সেসব বিষয়ে ইসলামের সুন্দর নীতিমালা রয়েছে। মালিকরা তাদের অধীনস্থ শ্রমিকদের সঙ্গে কী রূপ আচরণ করবে, সে সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেন, ‘এরা (শ্রমিকরা) তোমাদের ভাই, আল্লাহ এদের তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন। অতএব আল্লাহ তায়ালা যে ব্যক্তির ভাইকে তার অধীন করে দিয়েছেন, তার উচিত সে যা খাবে তাকেও তা খাওয়াবে, সে যা পরবে তাকেও তা পরাবে, আর যে কাজ তার পক্ষে সম্ভব নয়, সে কাজের জন্য তাকে কষ্ট দেবে না। আর যদি কষ্ট দেয়, তাতে নিজেও তাকে সাহায্য করবে।’ (মুসনাদে আহমদ : ৫/১৬৮; আবু দাউদ : ২/৩৩৭)
যথাসময়ে পারিশ্রমিক আদায়
শ্রমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পারিশ্রমিক। শ্রমিকের পারিশ্রমিক নির্ধারণের ক্ষেত্রে ইসলামী অর্থনীতি একটি সুন্দর ও সমাজের কল্যাণকর বিধান নির্ধারণ করেছে। মালিকরা তাদের শ্রমিকের পারিশ্রমিকের হার যতদূর সম্ভব বৃদ্ধি করবে, যাতে শ্রমিকরা তাদের জীবিকা নির্বাহের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যায় না পড়ে। শ্রমিকের পারিশ্রমিক আদায় করা সম্পর্কে আল্লাহপাক হাদিসে কুদসিতে বলেছেন, ‘এমন তিনটি লোক আছে কেয়ামতের দিন আমি তাদের শত্রæ হয়ে দাঁড়াব। এর মধ্যে তৃতীয় ব্যক্তিটি হচ্ছে, যে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কোনো লোক নিয়োগ করে অতঃপর তার কাছ থেকে পুরোপুরি কাজ আদায় করে নেয়, কিন্তু তার বিনিময়ে কোনো পারিশ্রমিক দেয় না।’ পারিশ্রমিক আদায়ে দীর্ঘসূত্রতা শ্রমিকদের জন্য একটি কষ্টকর ব্যাপার। সময়মতো বেতন না পেলে তাদের অনেক ভোগান্তির শিকার হতে হয়। এ জন্য শ্রমিকের পারিশ্রমিক আদায়ের তাড়া সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেন, ‘শ্রমিকের পারিশ্রমিক তার ঘাম শুকানোর আগেই দিয়ে দাও।’ (ইবনে মাজাহ : ২/৮১৭)
শ্রমিকের দায়িত্ববোধ
শ্রমের বিনিময়ে শ্রমিক পারিশ্রমিক পান। মালিকের কাছে এটা দাবি করা তার অধিকার। কিন্তু কারও অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব আদায়ের পর, কৃতচুক্তি সম্পাদনের পর। চুক্তি পূর্ণ করার ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা প্রতিশ্রæতি পূর্ণ কর। নিশ্চয়ই প্রতিশ্রæতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে’। (বনি ইসরাইল : ৩৪)
চুক্তি মোতাবেক মালিকের প্রদত্ত কাজ অত্যন্ত নিষ্ঠা ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে সম্পাদন করা শ্রমিকের প্রধান দায়িত্ব। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ ওই শ্রমিককে ভালোবাসেন, যে সুন্দরভাবে কার্য সমাধা করে।’ আমাদের সমাজে এমন কিছু শ্রমিক আছে, যারা মালিকের কাজে ফাঁকি দিয়ে নিয়মিত হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে বেতন তুলে নেয়, যা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। এ জন্য তাকে কেয়ামতের মাঠে অবশ্যই বিচারের সম্মুখীন হতে হবে।  শ্রমিক যদি তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব সুচারুরূপে পালন করে, তাহলে তার জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) দ্বিগুণ পুরস্কারের কথা ঘোষণা করে বলেন, ‘তিন শ্রেণির লোককে দ্বিগুণ সওয়াব প্রদান করা হবে। তাদের মধ্যে এক শ্রেণি হলো ওই শ্রমিক, যে নিজের মালিকের হক আদায় করে এবং আল্লাহর হকও আদায় করে।’
ইসলাম মূলত এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করতে চায়, যেখানে শ্রমিক-মালিক সবার অধিকারই সংরক্ষিত থাকবে এবং চাওয়ার আগেই প্রত্যেকের অধিকার আদায় করে দিতে সবাই উদ্বুদ্ধ হবে। ইসলামী সমাজে কোনো দাবি পেশের দরকার হয় না। যদি কোনো শ্রমিককে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়, সে দাবি প্রকাশের অধিকার রাখে। অধিকার আদায়ের দাবি কারও কাছে প্রার্থনা বা অনুকম্পার বিষয় নয়, বরং এ হচ্ছে তার বাঁচার অধিকার। বর্তমান বিশ্বে শ্রমিকের অধিকার আদায়ের মাধ্যম হিসেবে আন্দোলনকে বেছে নেওয়া হয়েছে, কিন্তু আন্দোলনের মাধ্যমে সাময়িকভাবে অধিকার আদায় করলেও চিরস্থায়ীভাবে সম্ভব নয়। শ্রমিক-মালিকের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখা একমাত্র ইসলামের আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমেই সম্ভব। শ্রমিক-মালিক উভয়পক্ষ যদি ইসলামের প্রদর্শিত নীতিমালা অনুসরণ করে, তাহলে শ্রমিকরা দাবি আদায়ের নামে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ করবে না, মালিকদেরও শোষণ করার মানসিকতা থাকবে না। উভয়ের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠবে এবং একে অপরের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করবে। আর এর মাধ্যমেই সমাজ এবং দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে, ইনশাআল্লাহ।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here