‘পদ্মা বিভাগ’ : প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে নতুন দিগন্তের সূচনা সম্ভব

0
62

জহিরুল ইসলাম খান: দেশের প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস করতে ঢাকা বিভাগের অন্তর্গত বৃহত্তর ফরিদপুরের ৫টি জেলা নিয়ে একটি নতুন বিভাগের প্রস্তাব করেছে সরকার। তবে এর ৩টি জেলার অধিবাসীরা ফরিদপুর বিভাগ না মেনে ঢাকা বিভাগেই থাকার জন্য বিক্ষোভ ও আন্দোলন করে দাবী জানান। এরই প্রেক্ষিতে বিতর্ক এড়াতে ফরিদপুর বিভাগ নাম না দিয়ে এই অঞ্চলের প্রবাহিত নদীর নামে অর্থাৎ ‘পদ্মা’ নামে বিভাগ ঘোষণা দেয়া হয় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে। তবে সম্প্রতি স্থানীয় সরকারমন্ত্রী কর্তৃক এই বিভাগীয় ‘সদর দপ্তর’ ফরিদপুর হবে এই ঘোষণার প্রেক্ষিতে অসন্তোষ ও আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে। তবে অন্যান্য বিভাগের মত সমস্ত বিভাগীয় প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর শুধুমাত্র ফরিদপুরে না করে মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুর এই তিন জেলার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে করে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের নতুন দিগন্তের সূচনা করা সম্ভব।

বিভাগ গঠনের ইতিহাস ও প্রস্তাবিত বিভাগে সর্বশেষ পরিস্থিতি:
স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের আগে দেশে চারটি বিভাগ ছিল। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা। তখন ঢাকায় ১৭টি, চট্টগ্রামে ১৫টি, রাজশাহীতে ১৬টি এবং খুলনা বিভাগে ১৬টি জেলা অন্তর্ভূক্ত ছিল। ১৯৯৩ সালে খুলনার মধ্যে ১০টি জেলা রেখে বরিশালের ৬টি জেলা নিয়ে বরিশাল বিভাগ গঠন করা হয়। ১৯৯৫ সালে বৃহত্তর সিলেটসহ চট্টগ্রামের ৪টি জেলা নিয়ে সিলেট বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১০ সালে রংপুর অঞ্চলের ৮টি জেলা নিয়ে রংপুর বিভাগ এবং রাজশাহী অঞ্চলের ৮টি জেলা নিয়ে বর্তমান রাজশাহী বিভাগ পুনর্গঠিত হয়।
২০১৫ সালে ঢাকা বিভাগের উত্তর অংশ থেকে প্রতিবেশী ৬টি জেলা বিভাগ গঠনের পরিকল্পনা করা হয়। এ সময় টাঙ্গাইল ও কিশোরগঞ্জবাসী নতুন ময়মনসিংহ বিভাগের অন্তর্ভুক্ত হতে অনীহা ও বিরোধিতা করে ঢাকা বিভাগের অন্তর্ভুক্ত থাকতেই ইচ্ছাপোষণ করে। ২০১৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর জামালপুর, শেরপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোণা এই ৪টি জেলা নিয়ে ময়মনসিংহ বিভাগ গঠিত হয়। যা বাংলাদেশের অষ্টম প্রশাসনিক বিভাগ।
এছাড়া একই সময়ে চট্টগ্রামের বর্তমান ১১টি জেলা থেকে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর এই ৬টি জেলা নিয়ে ‘ময়নামতি’ নামে একটি বিভাগ এবং ঢাকা বিভাগের দক্ষিণে পদ্মার ওপারে বৃহত্তর ফরিদপুরের ৫টি জেলা নিয়ে ‘পদ্মা’ নামে একটি বিভাগ ঘোষণার সিদ্ধান্ত হয়। নামকরণে মেনে নেয়া বা না নেয়া, প্রশাসনিক বিন্যাসে এবং বিভাগীয় দপ্তর স্থাপনে জটিলতা এবং স্থানীয়দের বিভিন্ন জেলার মানুষের বিরোধীতার মুখে যা এখনও বাস্তবায়ন হয়নি।

ঢাকা বিভাগেই থাকতে আন্দোলন ফরিদপুরের ৩ জেলার:
বৃহত্তর ফরিদপুরের ৫ জেলা নিয়ে ২০১৬ সালে ফরিদপুর বিভাগ হবে এই ঘোষণা দেয়ার পর থেকেই মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও গোপালগঞ্জ জেলায় আন্দোলন শুরু হয়। হাজার হাজার মানুষ মানববন্ধন করে, মিছিল করে, সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ করে তাদের দাবীর জানান দেয়।
মাদারীপুরবাসীর দাবী, তারা রাজধানী ঢাকার সাথেই থাকতে চান। কারণ ভৌগলিকভাবে মাদারীপুর থেকে ঢাকা আর ফরিদপুরের দূরত্ব প্রায় সমান। সড়ক পথে মাদারীপুর থেকে ফরিদপুরের দূরত্ব ৬৬ কিলোমিটার আর ঢাকার দূরত্ব ৪৮ কিলোমিটার। তবে ফরিদপুর যেতে যত সময় লাগে, পদ্মা নদীর কারণে ঢাকা যেতে তার চেয়ে কয়েক ঘন্টা সময় বেশি লাগে। তবে পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হলে প্রায় সমান সময়ই লাগবে। তাই পদ্মার সেতুর সুফল পাওয়ার জন্য মাদারীপুরবাসী ঢাকা বিভাগে থাকতে চান। এছাড়া এই জেলাবাসীর সার্বিক যোগাযোগ ঢাকা কেন্দ্রিক। এ কারণে তাদের ফরিদপুর বিভাগে যেতে তীব্র আপত্তি।
‘ঢাকা বিভাগ ছাড়বো না, অন্য বিভাগে যাবো না’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে গত দুই বছরে ২৫টি মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল, সড়ক অবরোধসহ প্রতিবাদ কর্মসূচী ছিল ‘মাদারীপুর জেলা ঐক্য পরিষদ’সহ বিভিন্ন স্থানীয় সংগঠনের। ছিল মানুষের তীব্র ক্ষোভ আর প্রতিবাদ।
একই সাথে শরীয়তপুর জেলার বাসিন্দারাও একই দাবী জানান। শরীয়তপুরের সাথে ঢাকার যোগাযোগ আরো সহজ। তাদের ঢাকা যেতে যে সময় লাগে ফরিদপুর যেতে তার দেড়গুণ সময় লাগে। এই অঞ্চলের মানুষের দাবীর মুখে সরকারের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই প্রস্তাবিত ফরিদপুর বিভাগ থেকে তাদের বাদ দেয়ার ঘোষণাও দেয়া হয়।
তবে আরো তীব্র অসন্তোষ রয়েছে বঙ্গবন্ধুর জন্মভূমি গোপালগঞ্জে। সরকারের পক্ষ থেকে একবার এই বিভাগকে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিজড়িত গোপালগঞ্জের নদী ‘মধূমতি’র নামকরণে ঘোষণা দেয়া হয়। কিন্তু পরে ‘পদ্মা’ নামে ঘোষণা দেয়ায় অসন্তোষ বিরাজ করছে। এছাড়া গোপালগঞ্জকে কেন্দ্র করেও বিভাগ তৈরিতে দাবী রয়েছে গণমানুষের।

পাঁচ জেলায় প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের সুফল:
স্থানীয় বিভিন্ন দপ্তরের তথ্য এবং আন্দোলনকারী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, সুধীমহল ও শ্রেণী-পেশার মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে যে, এই ৫টি জেলা নিয়ে বিভাগ গঠন করা হলে ৩টি জেলার জনগণ মেনে নেবে না। ফরিদপুর বিভাগ নামকরণ মেনে না নিলেও পদ্মা বা মধূমতি বিভাগ নামকরণ নিয়ে এই অঞ্চলের এলাকাবাসীর মধ্যে তেমন বিরোধ নেই। তারা যে কোন শৈল্পিক নামকরণ মেনে নিতেই আগ্রহী। তবে প্রশাসনিক অবকাঠামো প্রধানত তিনটি জেলার মধ্যে ভাগ করে দিলে সহজেই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব এবং সার্বিকভাবে জনগনের মেনে নেয়া সহজ হবে।
সরেজমিন পর্যবেক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট তথ্য মতে, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুর এই তিন জেলার সীমান্ত এলাকা হলো ‘টেকেরহাট বন্দর’ এলাকা। এই বন্দরটি কুমার নদীর তীরে একপাশে মাদারীপুর এবং গোপালগঞ্জ উভয় জেলার অন্তর্গত এবং কয়েক কিলোমিটার অদূরেই ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার সীমানা। এই টেকেরহাটের আশ-পাশের এলাকায় বিভাগীয় বিভিন্ন অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয় বা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হলে ফরিদপুরের ৫টি জেলার মানুষজনই সুবিধা পাবেন বলে সচেতন জনগণ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আলোচনায় মন্তব্য করেছেন।
উল্লেখ্য, টেকেরহাট বন্দর থেকে মাদারীপুর শহরের দূরত্ব ৩৫ কিলোমিটার, গোপালগঞ্জের দূরত্ব ৩৮ এবং ফরিদপুরের দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার। আর অন্য দুটি জেলার দূরত্ব ৪৫ থেকে ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে। বিভাগীয় সদর দপ্তরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন প্রশাসনিক, শিক্ষা, স্বাস্থ্

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here