রক্তঝরা জেলহত্যা দিবস আজ

0
48

আজ ৩ নভেম্বর, রক্তঝরা জেলহত্যা দিবস। বাঙালি জাতির ইতিহাসে কলঙ্কময় ও বেদনাবিধুর দিন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে জাতির পিতা ও সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবারের বেশির ভাগ সদস্যসহ হত্যার পর দ্বিতীয় কলঙ্কজনক অধ্যায় এ দিনটি। ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর তিন মাসেরও কম সময়ের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর সেনানী ও চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এ এইচ এম কামারুজ্জামান ও ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে এই দিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

বর্বরতম ওই ঘটনায় সেদিন শুধু বাংলাদেশের মানুষই নয়, প্রায় পুরো বিশ্ব স্তম্ভিত হয়েছিল। কারণ কারাগারের ভেতরে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা অবস্থায় এ ধরনের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। স্বাধীনতাবিরোধীদের ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়। দেশের এই চার শ্রেষ্ঠ সন্তানকে কারাগারে পাঠিয়ে ষড়যন্ত্রকারীরা প্রথমে গুলি এবং পরে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে। স্বাধীন বাংলাদেশের যে কটি দিন চিরকাল কালদিবস হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে, তার একটি ৩ নভেম্বর। যে কয়েকটি ঘটনা বাংলাদেশকে কাঙ্ক্ষিত অর্জনের পথে বাধা তৈরি করেছে, তার মধ্যে অন্যতমটি ঘটেছিল ১৯৭৫ সালের এ দিনে।

ভয়াল ও বিভীষিকাময় জেলহত্যার ৪৪ বছর অতিবাহিত হলেও ওই দিনের নিষ্ঠুরতা-পৈশাচিকতার ভয়াবহ ক্ষতচিহ্ন জাতির মনে এখনো স্পষ্ট। বাঙালি জাতি আজ জাতীয় চার নেতাকে গভীর শ্রদ্ধা ও অকৃত্রিম ভালোবাসায় স্মরণ করবে। প্রতি বছরের মতো এবারো ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বাঙালি জাতির সঙ্গে সশ্রদ্ধ চিত্তে যথাযথ মর্যাদা ও গুরুত্বের সঙ্গে শোকাবহ জেলহত্যা দিবসকে স্মরণ ও পালন করবে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে। দিবসটি পালনে সরকারি উদ্যোগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন আজ সারা দেশে নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল আলাদা বাণী দিয়েছেন। বাণীতে তারা শহীদ জাতীয় চার নেতার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান।

তথ্যমতে, বাঙালি জাতির ইতিহাসে কলঙ্কময় জেলহত্যা মামলার চূড়ান্ত বিচার ২০১৩ সালে নিষ্পত্তি হলেও পলাতক থাকা দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের সাজা এখনো কার্যকর হয়নি। মামলার ১১ আসামি বিদেশে পলাতক আছেন। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ওই ঘাতকদের দেশে ফিরিয়ে এনে শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কারা রয়েছেন, সে বিষয়েও অনুসন্ধান চলছে। বঙ্গবন্ধুর সরকারের মন্ত্রিসভার সবচেয়ে ঘৃণিত ও বিশ্বাসঘাতক সদস্য হিসেবে পরিচিত এবং ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর একপর্যায়ে স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদ এবং বঙ্গবন্ধুর দুই খুনি কর্নেল (অব.) সৈয়দ ফারুক রহমান এবং লে. কর্নেল (অব.) খন্দকার আবদুর রশীদ জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যার এ পরিকল্পনা করেন। এ কাজের জন্য তারা আগেভাগে একটি ঘাতক দলও গঠন করেন। এ দলের প্রধান ছিলেন ঘাতক রিসালদার মুসলেহ উদ্দিন। তিনি ছিলেন ফারুকের সবচেয়ে আস্থাভাজন। ১৫ আগস্ট শেখ মনির বাসভবনে যে ঘাতক দলটি হত্যাযজ্ঞ চালায়, সেই দলটির নেতৃত্ব দেন মুসলেহ উদ্দিন।

গবেষকদের মতে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর মোশতাকের নেতৃত্বে ষড়যন্ত্রকারীরা জাতীয় চার নেতাকে তাদের সরকারে যোগদানের প্রস্তাব দেন। কিন্তু জাতীয় চার নেতা সে প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। এ কারণে তাদের নির্মমভাবে জীবন দিতে হয়। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফ পাল্টা অভ্যুথান ঘটানোর পরেই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধুর আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণার পরপরই পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে জাতির জনককে তার ঐতিহাসিক ধানমন্ডির বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করে।

দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে সৈয়দ নজরুল ইসলাম বাংলাদেশ সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদ একটি স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় কোটি কোটি বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্ন পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বঙ্গবন্ধুর অন্য দুই ঘনিষ্ঠ সহযোগী এ এইচ এম কামারুজ্জামান ও ক্যাপ্টেন মনসুর আলী আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে নীতি ও কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

জানা যায়, ১৫ আগস্ট জাতির পিতা ও তার পরিবারের সদস্য এবং ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিহত জাতীয় চার নেতা হত্যার তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছিল লন্ডনে। এসব হত্যার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন ও বিচারের প্রক্রিয়াকে যেসব কারণ বাধাগ্রস্ত করেছে, সেগুলোর তদন্ত করার জন্য ১৯৮০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে ওই কমিশন গঠিত হয়। তবে সেই সময়ে বাংলাদেশের সরকারের অসহযোগিতার কারণে এবং কমিশনের একজন সদস্যকে ভিসা না দেওয়ায় উদ্যোগটি সফল হতে পারেনি। সে সময়ে সরকারপ্রধান ছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।

এ ছাড়া জেলহত্যার পরদিন তৎকালীন উপ-কারা মহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজন) কাজী আবদুল আউয়াল ঢাকার লালবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। তবে দীর্ঘ ২১ বছর এ বিচার প্রক্রিয়াকে ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত হয়। ১৯৯৮ সালের ১৫ অক্টোবর এ মামলায় ২৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। ২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মামলায় রায় দেন।

রায়ে রিসালদার মুসলেহ উদ্দিন (পলাতক), দফাদার মারফত আলী শাহ (পলাতক) ও এলডি (দফাদার) আবুল হাসেম মৃধাকে (পলাতক) মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামি সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, বজলুল হুদা ও এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদসহ ১২ জনকে জেলহত্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল হলে উচ্চ আদালত ২০০৮ সালে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ফারুক, শাহরিয়ার রশিদ, বজলুল হুদা ও এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদকেও খালাস দেন। উচ্চ আদালতের এ রায়ের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর আপিলের আবেদন (লিভ টু আপিল) করে সরকার। ২০১৩ সালের ৩০ এপিল ওই আপিলের ওপর রায় দেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।

আওয়ামী লীগের কর্মসূচি

আওয়ামী লীগের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- আজ সকাল ৬টায় রাজধানীর ধানমন্ডির বঙ্গবন্ধু ভবন ও গুলিস্তানে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ দেশের সর্বত্র দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ, কালো পতাকা উত্তোলন এবং কালোব্যাজ ধারণ। সকাল ৭টায় বঙ্গবন্ধু ভবনে জমায়েত এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ এবং সকাল ৮টায় বনানী কবরস্থানে জাতীয় চার নেতার কবরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, ফাতেহা পাঠ, মিলাদ মাহফিল ও মোনাজাত। একইভাবে রাজশাহীতে জাতীয় নেতা কামারুজ্জামানের কবরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, ফাতেহা পাঠ, মিলাদ মাহফিল ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া এ দিন বিকাল ৩টায় রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে (খামারবাড়ি, ফার্মগেট) আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। স্মরণসভায় সভাপতিত্ব করবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এক বিবৃতিতে আওয়ামী লীগের সব জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন শাখা এবং সব সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী, সমর্থক, শুভানুধ্যায়ী এবং সর্বস্তরের জনগণকে ৩ নভেম্বর যথাযথ মর্যাদা ও শোকাবহ পরিবেশে জেলহত্যা দিবস পালনের জন্য বিনীত আহ্বান জানিয়েছেন।
সূত্র: দৈনিক বাংলাদেশের খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here