নৌকাতেই জমে আছে জেলেদের হাসি-কান্না

0
55

আধুনিক সভ্যতায় মানুষ যেখানে উন্নত জীবন-যাপন করছেন, ঠিক সেখানে ভাসমান জেলেরা অভাবের সংসার চালাতে প্রচণ্ড শীতেও দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছেন যমুনা নদীতে। শুধু তাই নয়, জীবন সংসার চালাতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। কেউ কেউ বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে অন্য পেশা বেছে নিয়েছেন। যমুনায় জেগে উঠেছে অসংখ্য ডুবোচর। মিলছেনা পর্যাপ্ত পরিমাণ মাছ। এরপরও হাড় কাঁপানো শীতে যমুনায় মাছ ধরায় ব্যস্ত ৫০ বছরের মোংলা হাওয়ালদার। শুধু মোংলা একাই নন, তার মতো আরো অনেকেই রাতের অন্ধকার কেটে আলো ফোটার আগেই যমুনার এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত চষে বেড়ান পেটের তাগিদে। এভাবেই যমুনা নদীতে জেলেদের হাসি-কান্না জমে থাকে নৌকায়।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, কেউ ছেঁড়া জাল মেরামত করছেন, কেউ করছেন রান্নার কাজ, কেউবা আবার ঘুমাচ্ছেন। এই জেলেরা ১৫ থেকে ২০ দিনের জন্য নৌকা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন মাছ ধরতে। বাড়ি থেকে বের হবার পর নৌকাতেই শুরু হয় রান্না, খাওয়া, ঘুম। এমন দৃশ্য চোখে পড়ে উপজেলার কাজিপুর, চৌহালী, এনায়েতপুর, শাহজাদপুর ও সদরসহ অনেক জায়গাতে।

পেটের তাগিতে প্রত্যেক নৌকাতে প্রায় ৭/৮ জন জেলে থাকেন। নদীর জলে ভেসে ভেসে কাটিয়ে দিচ্ছেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। ঝুঁকি নিয়ে প্রতিনিয়ত জীবনযুদ্ধে লড়ছেন তারা।

সকাল বেলায় নৌকা নিয়ে বের হন মাছ ধরতে। নদীর বিভিন্ন এলাকায় মাছ ধরা শেষে বিকেলে ফিরে আসে সদর ও কাজিপুর উপজেলার বাজারের মাছের আড়তে। নদীপাড়ের স্থানীয় বাজারে মাছ বিক্রি করে পাওনাদারদের দেনা পরিশোধ ও খাবার সামগ্রী কেনার পর তাদের হাতে যৎসামান্য কিছু থাকে। সেই অর্থেই তাদের বাড়িতে চলে সংসার ও ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া।

কাজিপুর উপজেলার মেছড়া ইউনিয়নের আকনাদিঘী গ্রামের বাহেচ শেখের ছেলে আব্দুল মালেক (৪৫) ও লোকমান শেখের ছেলে বাদশা আলম (৪০) জানান, নদী এখন শুকিয়ে মাঝে মাঝে ডুবোচর পড়েছে। আবার কোথাও পলি জমে নালায় পরিণত হয়েছে। অনেকে বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে দিয়ে বিভিন্ন পেশায় চলে গেছেন। আমাদের বয়স হয়েছে। বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে কী করবো তাই কোনোরকম আমরা মানবেতর জীবনযাপন করছি।

ছোনগাছা ইউপি’র পাঁচ ঠাকুরী স্পার বাঁধ এলাকায় কথা হয় কুড়িগ্রাম জেলার চর জাৎরাপুর গ্রামের ময়নূল শেখের ছেলে নুর হোসেন ও আজগর আলীর ছেলে মিজানুরের সাথে। তারা বলেন, বাড়ী থেকে বের হয়ে ৭ থেকে ১০ দিন পরে বাড়িতে ফেরেন। আর মাছ না পেলে ১৫ থেকে ২০ দিন পর যেতে হয়। আমরা প্রতি নৌকায় ৭ থেকে ৮ জন জেলে থাকি। যে পরিমাণ মাছ জালে পাই বিক্রি করে টাকা সমান ভাগ করে নিই।

জেলে আব্দুল খালেক বলেন, নদীতে পর্যাপ্ত মাছ জালে পড়ছে না। এ নিয়ে চিন্তায় আছি। সপ্তাহে কিস্তি ও বাড়ীতে বউ পোলা আছে। যে পরিমাণ মাছ পাচ্ছি তাতে আমাদের কোনোরকম খেয়ে না খেয়ে দিন পার হচ্ছে। তারপরও জালে যদি বড় মাছ পড়ে, সেই মাছ এলাকার প্রভাবশালীরা নামমাত্র দামে নিয়ে যান।

সিরাজগঞ্জ জেলা মৎস্যজীবি সমিতি’র সভাপতি মোঃ সুরুতজামান জানান, যমুনা নদীর নাব্যতা হ্রাস পাওয়ায় জেলার চরাঞ্চলের এক হাজারের বেশি নৌ-শ্রমিক এবং জেলে আজ বেকার হয়ে পড়েছেন। ওইসব নৌ-শ্রমিক এবং জেলেরা বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে দিয়ে অতিকষ্টে জীবনযাপন করছেন। যমুনা নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনলে হয়তো ওই সব শ্রমিক ফের তাদের পেশায় জড়িয়ে পড়তে পারবেন। এজন্য নদী খনন করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে