পলাশীর পরাজয় ও আমাদের বোধোদয়

0
6

আবদুল আউয়াল ঠাকুর।। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন বাংলার স্বাধীনতা বিপন্ন হয়েছিল এনিয়ে কোন মহলেই বিতর্ক নেই। বোধকরি নিজেদের স্মরণীয় কোন দিন তারিখের কথা মনে না থাকলেও এই দিনটির কথা জানেনা এমন সাধারণ শিক্ষিত লোক পাওয়া কষ্টকর। আজকে স্বাধীনতা বলতে আমরা যা বুঝি সে সময়টা এরূপ ছিল না। তা সত্ত্বেও আমরা সবােই এক বাক্যে মেনে নেই আমরা আমাদের স্বাধীনতা হারিয়েছিলাম। পলাশীর প্রান্তরে যা ঘটেছিল এটি কোন যুদ্ধ নয় বরং প্রহসণ।এই একাঙ্কিকা একদিনে রচিত হয়নি। একটি দীর্ঘ সময় নিয়ে স্তরে স্তরে এগিয়েছে ।বলার অপেক্ষা রাখেনা ভারতবর্ষের সবচেয়ে পরাক্রমশীল ঐক্যবদ্ধ ভারতের প্রবক্তা মুগল শাসকদের নাকের ডগাতেই হয়েছিল। একজন বিদেশি হিসেবে ইংরেজ বনিকরা এসেছিল ভারতে বাণিজ্য করতে। ইতিহাস বলে একমাত্র তারাই ভারতে বাণিজ্য করতে এসেছিল তা নয়। তাদের আগেও অনেকেই ভারতে এসেছিল।মুগলদের আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে।বাণিজ্য নিয়ে যুদ্ধও এই প্রথম হয়নি। বিদেশি বনিকদের লক্ষ ছিল এককভাবে বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ। তাদের এথমদিককার লক্ষ ছিল গড়ম মসলা । তারা চেয়েছিল আরবীয় বনিকদের ভারতে আসা বন্ধ করা হোক । তারা আরবীয় বকনিকদের এদেশে থেকে পণ্য নিয়ে সরবরাহ করবে। ভারতীয় শাসকরা বলেছিলেন, তাদের নিষিদ্ধ নয় বরং উভয়ই বাণিজ্য করুক। এই প্রস্তার ইউরোপীয় বনিকরা মেনে নিতে পারে নি। ফলে তারা যুদ্ধ করেছে। পরাজিত হয়েছে ।এসব ঘটনা মুগলদের আগেকার ।
মুগল সম্রাটের অনুমতি নিয়েই ইংরেজ কোম্পানী ভারতে বাণিজ্য শুরু করেছিল।হয়ত তেমনাটাই করতো যদি না এ অঞ্চলে তখনকার রাজনীতিতে অন্য গন্ধ তা না পেত। বাংলার রাজধানী ছিল ঢাকা।বলাযায় ঢাকা যত,দিন বাংলার রাজধানী ছিল ততদিন নিরাপদই ছিল। যেসব বিবেচনায় ঢাকবাকে বেছে নেয়া হয়েছিল তা বহাল থাকলেও একান্ত ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দের কারণেই ঢাকা থেকে রাজধানী পরিবর্তিত হয় মুর্শি‍দাবাদ চলে যায়। মুর্শিদাবাদ নিয়েই যত প্রসঙ্গ ।ঠিক মুর্শিদ কুলি খান যার নামানুসারে এই নামকরন করা হয় তিনি মূলত একজন ধর্মন্তরিত মুসলিম ছিলেন।নিজ গুণে রাজানুকল্য লাভে সমর্থ হয়েছিলেন। যাইহোক ঢাকা থেকে কেন বাংলার রাজধানী পরিবর্তিত হয়েছিল সে আলোচনা দীর্ঘ । এটুকু বলাচলে ঢাকা বা এ অঞ্চলের মানুষের বেড়েওঠার ইতিহাস আর মুর্শিদাবাদের ইতিহাস এক নয়।মূলত অর্থনৈতিক দেউলিয়া পনার সুযোগ গ্রহণ করেছিল ইংরেজ বণিকেরা ।আর এদেশের সুদী কারবারি হিন্দু মহাজনেরা তার সুফল ভোগ করতে চেয়েছিল। সেই সাথে লোভী স্বার্থপর সেনাপতি মীর জাফর সুর মিলিয়েছিল। এটা বলার অপেক্ষা রাখেনা, ইংরেজদের বিবেচনায় এরকম বিশ্বস্ত বিশ্বাসঘাতক আর একজনও তারা পায়নি। পলাশীর পরে অনেকেই লড়ার চেষ্টা করছেন তবে সেটি ছিল আত্মহনন প্রক্রিয়া । মীর কশিম তাদের একজন ।স্বাধীনতা হারাবার পর বুঝেছিল কতবড় ভুল তারা করেছিল ।আসলে তখন সময় অতিক্রান্ত। মুগল শাসনের একটা বড় দুর্বলতা ছিল তাদের ধর্মীয় সংস্কৃতি। তারা শাসন করেছেন কিন্তু জনগণের সাথে মিশতে চাননি। এর অবশ্য নানা ব্যাখ্যা রয়েছে। তাদের ধর্মীয় বোধ বিশ্বাসসহ আরো কিছু প্রসঙ্গ রয়েছে। নজরানা দেয়ার বাহানায় যে ইংরেজ কোম্পানী ভারতে বৈধভাবে প্রবেশ করেছিল তারাই অবৈধভাবে প্রথমে বাংলার এবং পরে গোটা ভারত দখল করেনিল।কার্যত ভারতের ততকালীল সমাজের বিশ্লেষণ করলে এটা নি:সন্দেহে বলা যায় ভারতে ইংরেজরা সুকৌশলে যে সাম্প্রদায়িক বীজ বপন করেছিল তার সুবাদেই প্রায় দুশো বছরেরও বেশি সময় ভারত শাসন করেছিল। আর এখনো পরোক্ষভাবে ভারত শাসন আইন দ্বারাই এ অঞ্চল শাসিত হচ্ছে।শাসকের পরিবর্তন হলেও শাসন নীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন খুব একটা এসছে বোধকরি সেটা বিশ্লেষণে বলা যাবে না।
আরবীয় বনিকদের সাথে এ অঞ্চলের তথা পূর্ববঙ্গের জনগণের সম্পর্ক আত্মীক। অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদ থেকেই মূলত এ অঞ্চলের মানুষেরা আরবীয় বনিকদের সাথে আত্মীক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। ইসলামের মহানুভবতা সহনশীলতা তাদের আকৃষ্ট করেছিল। মূলত সিন্দু জয়ের পর থেকেই আরবীয় বনিকদের যাতায়ত বেড়ে গিয়েছিল। তারা কখনো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করতে চায়নি।করেও নি। ব্রাহ্মণ লক্ষণ সেন পালিয়ে গিয়েছিল ইখতিয়ার উদ্দীন বিন বখতিয়ারে আগমণের কথা শুনে।মূলত এরপর আর এঅঞ্চলে খুব একটা দাপট তাদের ছিল না । ততদিনে এ অঞ্চলের মানুষের মন মানসিকতায় ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল। যাই হোক এটা বলা বোধহয় অনুচিত নয় যে সেই প্রতিশোধ তারা নিতে চেয়েছিল পলাশীতে।আর এর সহযোগী হয়েছিল অনেকেই। মুর্শিদ কুলি খান কেবলমাত্র কর দেয়ার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বার ভূঁইয়াদের বঞ্চিত না করলে হয়ত পলাশীর প্রান্তরে অন্য ঘটনা ঘটতে পারত। যাই হোক সেসব আলোচনা এখন অর্থহীন।
আমরা যতবার পলাশীতে ফিরে আসি ততবারই স্বাধীনতা এবং বিশ্বাসঘাতকদের নাম উচ্চারণ করি । একটি করি দেশপ্রেমে অন্যটি ঘৃণায় । বাস্তবে আমাদের এই বোধ রাজনীতিতে কতটা সক্রিয়। আমরা দু দুবার স্বাধীনতা অর্জণ বরেছি । ইতিহাস বলে বৃটিশদের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম এ অঞ্চলের মানুষেরাই প্রতিরোধ তৈরি করেছিল। সেজন্য প্রচন্ড মূল্যও দিততে হয়েছে। সে লড়াই টিকেনি তবে মাঠেও মারাযায়নি। এর সূত্র ধরেই একসময় স্বাধীনতা এসেছে।আমরা সেখানেও দাড়িয়ে থাকিনি ।রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আ মরা ৭১ সালে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করেছি।
এ বারের পলাশী দিবসকে সামনে রেখে এ অঞ্চলের ভূগোলে দিকে একটু তাকানো দরকার। নেপাল তার নতুন ম্যাপ ঘোষনা করেছে চীনের সাথে ভারতের অবস্থা নাজুক।এ অঞ্চলের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ। আমাদের ইতিহাস হচ্ছে টিকে থাকবার ।পলাশীর বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে যদি যদি সিদ্ধান্ত নিতে হয় তাহলে অবশ্যই জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক শত্রু মিত্র সস্মর্কে সজাগ থাকতে হবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে