”মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাম্রাজ্যবাদী-আগ্রাসী বিষধর সাপ, সে কারও বন্ধু হতে পারে না! ”

0
4

ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশকে নিয়ে চীন ও আমেরিকার মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন ডেপুটি সেক্রেটারি অব স্টেট স্টিফেন বিগান ঢাকা সফরে এসে বাংলাদেশকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিক জোটে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। তো ইন্দো-প্যাসেফিক জোটে বাংলাদেশকে নিয়ে চীন-আমেরিকার প্রতিযোগিতা সম্পর্কে আমারা কথা বলেছি বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কলামিস্ট আবদুল আউয়াল ঠাকুরের সঙ্গে। রেডিও তেহরানকে দেয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বিষধর সাপের সাথে তুলনা করেছেন।

আমেরিকা কারও বন্ধু হলে তার আর শক্রর প্রয়োজন হয়না বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আমেরিক একটি সাম্রাজ্যবাদী ও শোষক রাষ্ট্র।

আবদুল আউয়াল ঠাকুর বলেন, আমেরিকা সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের সুবিধা নিতে চায় বলেই বন্ধুত্বের কথা বলে। তাদের খোলসটা হচ্ছে নখর দন্ত্যপূর্ণ বিষধর সাপের মতো যে ছোবল দিলে তা থেকে মুক্তির আর কোনো  উপায় থাকে না।

পুরো সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো। এটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান: জনাব আবদুল আউয়াল ঠাকুর, সম্প্রতি গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে চীন এবং আমেরিকা? দুই শক্তির এই প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের জন্য আশঙ্কার কারণ বলে অনেকে মনে করছেন। বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

আবদুল আউয়াল ঠাকুর: যেকোনো শক্তির প্রতিযোগিতায় তার নিকট এবং দূরের প্রতিবেশীর জন্য নানাধরণের প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। বিশেষ করে যখন দুটি পরাশক্তি পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় তখন অন্যান্য দেশগুলোর সম্পর্কের ভারসাম্যে নানান পরিবর্তন সাধিত হয়। আর বিষয়টি গভীর বিবেচনার দাবি রাখে। আমাদের আলোচ্য ক্ষেত্রে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল। এশিয়ান প্যাসিফিক অঞ্চলকে ভারত মহাসাগর কিংবা ভারতকে অর্ন্তভুক্ত করার বিবেচনা থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইন্দো প্য-সিফিক  শব্দটি যুক্ত হয়েছে। আর এই ইন্দো শব্দটি যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি বিশেষ বিষয় আপনা আপনিই এখানে এসে দাঁড়িয়েছে। আর সেই প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায় কিভাবে যাবে সেটি মূলত সময় বলে দেবে।

ইন্দো-প্যাসিফিক জোট

যদিও মূল বিষয়গুলো এখনও পরিপক্কতা অর্জন করেনি তারপরও কিছু কিছু আলামত এবং পর্যবেক্ষণ এরইমধ্যে ভাবিয়ে তুলতে শুরু করেছে। আমি মনে করি এখানে নীরব ভূমিকা পালন করার কোনো সুযোগ বাংলাদেশের থাকবে না। কম শক্তিসম্পন্ন দেশগুলোর সবসময় কিছু সমস্যা আছে। একূল রাখি না ওকূল রাখি-এরকম একটা অবস্থার মধ্যেই তাদেরকে চলতে হয়। বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ এবং আমদানি নির্ভর একটি দেশ। শুধু তাই নয় দেশটিকে রেমিটেন্সের ওপর অনেক বেশি নির্ভর করতে হয়। ফলে বিভিন্ন দেশের সাথে সম্পর্কের বিষয়টি নানা মাত্রিকতায় বিবেচনা করতে হবে। আর বিষয়টি নানা মাত্রিকতায় যাবে সেটা মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

রেডিও তেহরান: চীন বাংলাদেশের অর্থনীতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তুলনামূলক কম দামে পণ্য পেতে চাইলে চীন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভরসাস্থল। আবার আমেরিকায় বাংলাদেশ প্রচুর পরিমাণে পণ্য রপ্তানি করে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ কার পক্ষে অবস্থান নেবে অর্থাৎ বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান কি হওয়া উচিত?

আবদুল আউয়াল ঠাকুর: আজকের বিশ্বে প্রতিযোগিতামূলক যে বাজার সেখানে চীন অত্যন্ত সফল একটি দেশ। শুধু বাংলাদেশ নয় গোটা বিশ্বের এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও চীনা পণ্যের ছড়াছড়ি। এর কারণ হচ্ছে চাহিদা। অবশ্য বাংলাদেশ কিন্তু আমেরিকার একটি বড় অর্থনৈতিক অংশীদার। তা সত্ত্বেও চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা। চীন এমন একটি দেশ যে বন্ধুত্বের গুরুত্ব দেয়। না সে গণতন্ত্র কিংবা সমাজতন্ত্র রপ্তানি করে, সে একমাত্র অর্থনীতি রপ্তানি করে। আর এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সাথে চীনের যে একটি বিশেষ সম্পর্ক আর সেটি নতুন জায়গায় উন্নীত হয়েছে তার কারণ হচ্ছে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা। আমরা এটাকে যেভাবেই বলি না কেন, বন্ধুত্বের অর্থ এই নয় যে শুধু নেব দেব না। ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক গভীরতর বলা হলেও বর্তমানে মূলত সেটি শীতলতর পর্যায়ে চলে আসতে শুরু করেছে। কারণ দেয়া নেয়ার প্রশ্ন!

তবে সেদিক থেকে বাংলাদেশের সাথে চীনের সম্পর্ক যেকোনো বিবেচনাতেই  উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর পেছনে মূল কারণ হচ্ছে চীনের আন্তরিকতা এবং বন্ধুত্বের প্রতি প্রতিশ্রুতির কারণে। বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কিছু কথা বলা হয়েছে। তাঁরা ইন্দো-প্যাসিফিক প্যাক্ট কিংবা আলোচনার মধ্যে কেবলমাত্র অর্থনৈতিক সম্পর্কে যুক্ত হতে প্রস্তুত। কিন্তু মূল বিষয়টি-ইন্দো প্যাসিফিক ধারণার মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রির কৌশল রয়েছে। তারা চায় এই অঞ্চলসহ সারা বিশ্বে এমন একটা অবস্থা তৈরি করতে যেখানে কেবলমাত্র মার্কিন অস্ত্র বিক্রি হবে। তবে সেই অস্ত্র বিক্রির সাথে বাংলাদেশ যুক্ত নয় কিংবা যুক্ত হতে চায় না সেটা স্পষ্ট করে বলেছে।

Image Caption

তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার স্ট্র্যাটেজিক ভিউ থেকে অস্ত্র বিক্রির যে কৌশল গ্রহণ করতে চায় তার সাথে বাংলাদেশ অবশ্যই দ্বিমত পোষণ করেছে। আর সেটি বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশার সম্পূরক বলে মনে করার যথেস্ট কারণ রয়েছে।

রেডিও তেহরান: ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশকে নিয়ে চীন এবং আমেরিকার মধ্যে প্রতিযোগিতা আছে। একই রকমের প্রতিযোগিতা ভারত এবং চীনের মধ্যে। প্রশ্ন হচ্ছে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্বটা আসলে কোথায়? অর্থাৎ কি কারণে বাংলাদেশ এতটা গুরুত্বপূর্ণ এসব বড় বড় শক্তির কাছে?

আবদুল আউয়াল ঠাকুর: দেখুন, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল বলছি সেখানে কিন্তু চীন সাগর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চীন সাগরে বিশাল জ্বালানীর মজুদ রয়েছে। জাপান জ্বালানীবিহীন দেশ। তাকে জ্বালানী আমদানি করে চলতে হয়। এই যে জ্বালানীর উপর চোখ যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে অন্যান্য দেশের- সেটি কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার অনেকগুলো কারণের মধ্যে প্রধান একটি কারণ হচ্ছে বঙ্গোপসাগর।

চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে

ওয়ান বেল্ট পলিসি অর্থাৎ যে মহাসড়কের কথা আলোচনা করা হয়েছে নতুন সেই চিন্তার ফলে চীন, বাংলাদেশ, মিয়ানমার-অর্থাৎ পুরো অঞ্চলের মধ্যে একটি নতুন আন্তসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার যে আয়োজন সেই আয়োজনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘোরতর আপত্তি রয়েছে। কারণ মার্কিন পলিসির কারণে তারা হয়তো মনে করে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে একটি জুৎসই ঐক্য গড়ে উঠলে আমেরিকা এবং ইউরোপের জন্য একটি মারাত্মকরকম বিপর্যয় সৃষ্টি হবে। বাংলাদেশকে তারা নানাভাবে ব্যবহার করতে চায়। এদিকে চীনের সাথে রাশিয়ার,  পাকিস্তানের এবং ইরানের সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ ইরান, চীন, রাশিয়া এবং পাকিস্তান সবকিছু মিলিয়ে এই অঞ্চলে একটি নতুন ভূগোলের চিত্র তৈরি হয়েছে। সেই চিত্রের মধ্যে ধর্ম নয় মূলত আগ্রাসন প্রতিরোধের একটি দৃঢ় প্রবণতা রয়েছে। আর সেই প্রবণতার মধ্যে যদি আমেরিকা বাংলাদেশকে ব্যবহার করতে পারে তাহলে তারা মনে করে নতুন ভূগোলে তারা একটি আঘাত করতে পারবে। বিশ্ব ব্যাংকের মাধ্যমে গোটা বিশ্বকে শোষণ এবং শাসন করার কিংবা ভয়-ভীতি দেখানোর যে একটা অবস্থা অতীতে ছিল এখন আর সেই অবস্থা নেই। পৃথিবীতে নতুন একটি অর্থনৈতিক এবং সামাজিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। আর সেই বাস্তবতাকে মোকাবেলার জন্য বাংলাদেশের সমুদ্র বন্দরকে আমেরিকা ব্যবহার করতে চায় নতুন একটা ফেনোমেনা হিসেবে যাতে তাদের প্রবেশ পথটা পরিস্কার করা যায়। বঙ্গোপসাগরকে নিয়ন্ত্রণের জন্য বাংলাদেশকে তারা তাদের অংশভুক্ত করার জন্য ভীষণ আগ্রহী হয়ে উঠেছে বলে আমি মনে করি।

রেডিও তেহরান: আমেরিকার ব্যাপারে অনেকে আশঙ্কা করেন যে, দেশটি যাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে সময়ের ব্যবধানে তাকেই আবার শত্রু বানিয়েছে। এ বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কি?

আমেরিকা একটি ঘাতক রাষ্ট্র: আউয়াল ঠাকুর

আবদুল আউয়াল ঠাকুর: দেখুন, মার্কিন যুক্তরাস্ট্র ইরাকের বাগদাদে ইরানের জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে যে হত্যা করেছে তা থেকে বোঝা যায় দেশটি একটি ঘাতক রাষ্ট্র। কোনো ঘাতক দেশ কারও বন্ধু হতে পারে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে প্রচলিত শব্দ হচ্ছে-তাদের বন্ধু হলে আর শক্রর প্রয়োজন নেই। বিশ্বে যেসব দেশের সাথে আমেরিকা বন্ধুত্ব করেছে- যেমন ধরুন একসময় পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তির আড়ালে দেশটির সামরিক শাসন থেকে শুরু করে যতগুলো ঘটনা ঘটেছিল-তার পরিণতি পাকিস্তানের জন্য সুখকর ছিল না। এই অঞ্চলের যতগুলো দেশের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক হয়েছে প্রত্যেকের সাথে কৌশলে অন্য একজনকে লেলিয়ে দিয়েছে তাকে ঘায়েল করার জন্য। আমেরিকা যখন কোনো দেশের বন্ধু হয়-সেটি আসলে বন্ধুত্ব নয়; সেটি তার কৌশলগত অবস্থান। সে আসলে শোষণ করতে চায়, অস্ত্র বিক্রি করতে চায় এবং সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের সুবিধা নিতে চায় বলেই বন্ধুত্বের কথা বলে। তাদের খোলসটা হচ্ছে নখর দন্ত্যপূর্ণ বিষধর সাপের মতো যে ছোবল দিলে তা থেকে মুক্তির আর কোনো  উপায় থাকে না।

 

 

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে